চাঁদের উৎপত্তির রহস্য আজও অমীমাংসিত! 'থেইয়া ইমপ্যাক্ট হাইপোথিসিস' ঘিরে এক নতুন বিতর্কে সরগরম বৈজ্ঞানিক মহল | সাতকাহন

 'সাতকাহন'-এর এই বিশ্লেষণে চন্দ্রের উৎপত্তির রহস্য, 'জায়ান্ট ইমপ্যাক্ট হাইপোথিসিস', সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং মহাকাশ বিজ্ঞানের আকর্ষণীয় ও স্বল্প-পরিচিত সব তথ্য সম্পর্কে জানুন।

চাঁদের উৎপত্তি ঘিরে নতুন রহস্য; 'থেইয়া হাইপোথিসিস' নিয়ে উঠছে বড় প্রশ্ন।

চাঁদের জন্ম কি কোনো মহাজাগতিক মহাপ্রলয়ের ফল? "থেইয়া" তত্ত্ব ঘিরে নতুন করে বিতর্ক দানা বাঁধছে, সাড়ে ৪শ কোটি বছরের এক রহস্য আজও অমীমাংসিত

পৃথিবী ও থেইয়া গ্রহের সংঘর্ষের পর চাঁদের গঠনপ্রক্রিয়ার একটি বৈজ্ঞানিক দৃশ্যরূপ।
পৃথিবী ও ‘থেইয়া’ গ্রহের মধ্যকার সেই মহাবিপর্যয়কর সংঘর্ষের একজন শিল্পীর চিত্ররূপ, এমন একটি ঘটনা, যা বিজ্ঞানীদের মতে চাঁদের সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছিল।

রাতের আকাশে ভাসমান চাঁদকে মানুষ কেবল সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবেই দেখেনি; এটি অগণিত পৌরাণিক কাহিনি, রোমান্টিক উপাখ্যান, কবিতা এবং বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানেরও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। তবুও, যে প্রশ্নটি আজও বিজ্ঞানকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে চলেছে, তা হলো, চাঁদের জন্ম হয়েছিল কীভাবে? আধুনিক জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞান এ বিষয়ে বহু সূত্র বা ইঙ্গিত খুঁজে পেলেও, এই মৌলিক প্রশ্নের কোনো চূড়ান্ত ও নিশ্চিত সমাধান আজও অধরাই রয়ে গেছে। ঠিক এই কারণেই  সাতকাহন  আজ বহুল আলোচিত "থেইয়া ইমপ্যাক্ট থিওরি" বা 'থেইয়া সংঘর্ষ তত্ত্ব'-এর মূল ভিত্তি, একে ঘিরে থাকা বিতর্ক এবং নতুন বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণগুলো নিয়ে পুনরায় আলোচনা করছে।

পৃথিবীর সঙ্গে সংঘর্ষ, আর ঠিক তার পরপরই চাঁদের জন্ম?

বৈজ্ঞানিক মহলের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মনে করেন যে, প্রায় সাড়ে ৪শ কোটি বছর আগে সদ্য গঠিত পৃথিবীর সঙ্গে মঙ্গল গ্রহের আকারের প্রায় সমান একটি বিশাল মহাজাগতিক বস্তুর সংঘর্ষ ঘটেছিল। এই গ্রহসদৃশ বস্তুটির নাম দেওয়া হয়েছে "থেইয়া" (Theia)। সেই সংঘর্ষ এতটাই প্রলয়ঙ্করী ছিল যে, পৃথিবীর বাইরের স্তরের খণ্ডাংশগুলো, সঙ্গে থেইয়ার ধ্বংসাবশেষ, মহাকাশের বিশাল প্রান্তরে ছড়িয়ে পড়েছিল। পরবর্তীতে, সেই গলিত পদার্থগুলো একত্রিত হয়ে ধীরে ধীরে চাঁদের রূপ ধারণ করে।

এই অনুমান বা তত্ত্বটি "জায়ান্ট ইমপ্যাক্ট হাইপোথিসিস" (Giant Impact Hypothesis) নামে পরিচিত। দীর্ঘকাল ধরে এটিকে চাঁদের জন্ম সংক্রান্ত সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা হিসেবে গণ্য করা হয়ে আসছে; কারণ এটি পৃথিবী ও চাঁদ নিয়ে গঠিত এই মহাজাগতিক ব্যবস্থার বহু বৈশিষ্ট্যকে, যার মধ্যে রয়েছে তাদের কক্ষপথের গতিপ্রকৃতি, ঘূর্ণন বৈশিষ্ট্য এবং ভরের বিন্যাস, সফলভাবে ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হয়েছে।

কিন্তু 'থেইয়া' (Theia)-র অস্তিত্বের প্রমাণ কোথায়?

সমস্যার সূত্রপাত হলো তখন, যখন বিজ্ঞানীরা পৃথিবী থেকে প্রাপ্ত শিলাগুলোর পাশাপাশি চাঁদ থেকে নিয়ে আসা শিলাগুলোর রাসায়নিক গঠন বিশ্লেষণ করতে শুরু করলেন। সাধারণভাবে এমনটাই ধারণা করা হতো যে, যদি অন্য কোনো গ্রহের সাথে সংঘর্ষের ফলে চাঁদের জন্ম হয়ে থাকে, তবে চাঁদের মধ্যে সেই অন্য মহাজাগতিক বস্তুটির স্বতন্ত্র রাসায়নিক ছাপ বা বৈশিষ্ট্য স্পষ্টভাবে বিদ্যমান থাকার কথা।

তবে বাস্তবে দেখা গেল, চাঁদের রাসায়নিক গঠন পৃথিবীর গঠনের সাথে অবিশ্বাস্য রকমের নিখুঁতভাবে মিলে যাচ্ছে। অক্সিজেনের আইসোটোপ থেকে শুরু করে বিভিন্ন খনিজ গঠন, সবক্ষেত্রেই এই সাদৃশ্যগুলো এতটাই গভীর ছিল যে, বিজ্ঞানী মহলের একটি অংশ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলতে শুরু করলেন: যদি 'থেইয়া'-র অস্তিত্ব সত্যিই থেকে থাকে, তবে তার নিজস্ব রাসায়নিক ছাপটি কোথায় হারিয়ে গেল?

ঠিক এই প্রশ্নটিই মহাকাশ বিজ্ঞানের অন্যতম সুপ্রতিষ্ঠিত একটি তত্ত্বের ভিত্তিমূলকে আমূল নাড়িয়ে দিয়েছে।


নতুন গবেষণায় বিজ্ঞানীরা কী বলছেন?

সাম্প্রতিক কিছু গবেষণা একটি নতুন সম্ভাবনার কথা তুলে ধরছে। বিজ্ঞানীদের মতে, ওই সংঘর্ষের পরপরই পৃথিবী এবং 'থেইয়া', উভয়ই এতটাই তীব্রভাবে উত্তপ্ত ও গলিত হয়ে পড়েছিল যে, তাদের উপাদানগুলো একে অপরের সাথে প্রায় পুরোপুরি মিশে গিয়েছিল। ফলে, সেই ধ্বংসাবশেষ বা বস্তুপিণ্ড, যা থেকে পরবর্তীতে চাঁদের সৃষ্টি হয়েছিল, তা মূলত ছিল পৃথিবী এবং 'থেইয়া' উভয়েরই একীভূত বা মিশ্রিত রূপ।

যদিও এই ব্যাখ্যাটি চাঁদ ও পৃথিবীর মধ্যকার রাসায়নিক সাদৃশ্যের বিষয়ে একটি আংশিক উত্তর প্রদান করে, তবুও এ নিয়ে বিতর্ক এখনো পুরোপুরি থামেনি, কারণ, আরও অনেক প্রশ্নের উত্তরই এখনো অজানা রয়ে গেছে।

চাঁদের অভ্যন্তরে কী লুকিয়ে আছে?

আজও চাঁদের অভ্যন্তরীণ গঠন সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। পৃথিবীর মতোই চাঁদের কি কোনো সক্রিয় ধাতব কেন্দ্র (core) রয়েছে? এর চৌম্বক ক্ষেত্রটি এত দুর্বল কেন? তাছাড়া, পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব এবং এর কক্ষপথ কীভাবে এত বিস্ময়করভাবে স্থিতিশীল রয়ে গেছে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার প্রচেষ্টায়, বর্তমানে উন্নত সুপারকম্পিউটার ব্যবহার করে বিলিয়ন বিলিয়ন কাল্পনিক সংঘর্ষের সম্ভাব্য মডেল তৈরি করা হচ্ছে। কেউ কেউ মনে করেন যে, ওই সংঘর্ষটি ঘটেছিল মুখোমুখি বা সরাসরি; আবার অন্যদের মতে, এটি ঘটেছিল একটি তির্যক কোণে। এমনকি এমন একটি অনুমানও প্রচলিত আছে যে, শুরুতে পৃথিবীর চারপাশে একাধিক ছোট ছোট উপগ্রহ গঠিত হয়েছিল, যা পরবর্তীতে একত্রিত হয়ে আজকের এই চাঁদের জন্ম দিয়েছে।

'সাতকাহন'-এর বিশ্লেষণে, ঠিক এই জায়গাতেই বিজ্ঞান সবচেয়ে বেশি চিত্তাকর্ষক হয়ে ওঠে, কারণ প্রতিটি নতুন আবিষ্কার অনিবার্যভাবেই একগুচ্ছ নতুন ও অমীমাংসিত প্রশ্নের দ্বার উন্মোচন করে।

চাঁদের দক্ষিণ মেরু নিয়ে এত তীব্র আগ্রহ কেন?

বর্তমানে সারা বিশ্বের বিভিন্ন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা, যার মধ্যে নাসা (NASA)-ও অন্তর্ভুক্ত, চাঁদের দক্ষিণ মেরু অঞ্চলটির প্রতি গভীর আগ্রহ প্রদর্শন করছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই অঞ্চলে প্রাপ্ত প্রাচীন শিলাগুলোর মধ্যে আমাদের সৌরজগতের আদি মুহূর্তগুলো সম্পর্কিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূত্র লুকিয়ে থাকতে পারে।

ভবিষ্যতের চন্দ্রাভিযানগুলো থেকে সংগৃহীত নতুন নমুনাগুলো হয়তো শেষ পর্যন্ত উন্মোচন করবে যে, "থেইয়া ইমপ্যাক্ট" (Theia Impact) তত্ত্বটি ঠিক কতটা সত্য এবং কতটা তা কেবলই অনুমানের ওপর নির্ভরশীল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চাঁদের রহস্য উন্মোচন করার অর্থ কেবল একটি একক উপগ্রহের ইতিহাস বোঝা নয়; বরং এর গভীরে লুকিয়ে আছে পৃথিবীর জন্ম, সৌরজগতের বিবর্তন এবং গ্রহ গঠনের নিয়ন্ত্রক মহাজাগতিক প্রক্রিয়াগুলো সম্পর্কিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সব সূত্র।

সাতকাহন: শেষ কথা | আকাশের চাঁদটি কি আসলে কোনো মহাপ্রলয়েরই এক অবশেষ?

যে চাঁদের দিকে আমরা প্রতিদিন তাকিয়ে থাকি, তা হয়তো কেবল সৌন্দর্যেরই প্রতীক নয়। এর জন্মের নেপথ্যে লুকিয়ে থাকতে পারে এক মহাপ্রলয়ঙ্করী মহাজাগতিক সংঘর্ষের ইতিহাস। পৃথিবীর একমাত্র এই প্রাকৃতিক উপগ্রহটি, এমনকি আজও, সেই ধ্বংসলীলার প্রতিধ্বনি বহন করে চলেছে, যা ঘটেছিল কোটি কোটি বছর আগে।

আর তাই, চাঁদের রহস্য উন্মোচনের এই অনুসন্ধান কখনোই থামবে না। কারণ, মানুষ যখন আকাশের দিকে তাকায়, তখন তারা কেবল এই মহাবিশ্বকেই পর্যবেক্ষণ করে না; বরং তারা নিজেদের উৎপত্তির ইতিহাসকেও খুঁজে পেতে চায়।

আরও পড়ুন: পুরুষই গর্ভবতী!    চোখ নেই, তবু ক্যামেরায় ধরা পড়েছে পৃথিবী      যে মেয়ে মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে বিশ্বকে কাঁদিয়েছিল      নদীর মৃত্যুদূত

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন