অন্ধকারের সঙ্গে কথোপকথন: প্রণব লালের ক্যামেরায় দেখা এক অন্য পৃথিবী
চোখ ছাড়াই ছবি তোলা কি সত্যিই সম্ভব? এই প্রশ্নটাই আমাকে প্রথম নাড়া দিয়েছিল, যখন আমি দৃষ্টিহীন ফটোগ্রাফার প্রণব লাল, এর কাজের সঙ্গে পরিচিত হই। জন্মগতভাবে সম্পূর্ণ দৃষ্টিশক্তিহীন হয়েও তিনি যে ভাবে ক্যামেরার মাধ্যমে পৃথিবীর গল্প বলছেন, তা শুধু বিস্ময় নয়, এক গভীর উপলব্ধির নাম। এই উপলব্ধির পথ ধরেই শুরু হয়েছে আমার অনুসন্ধান, যার শিরোনাম Dialogue of the Darkness। এখানে অন্ধকার নিছক অনুপস্থিতি নয়, বরং এক সক্রিয় ভাষা। Dialogue of the Darkness, এ প্রণব লালের ফটোগ্রাফি চোখের ওপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে শব্দ, অনুভব আর কল্পনার ওপর। তাঁর প্রতিটি ফ্রেম যেন অন্ধকারের সঙ্গে এক নিরব সংলাপ, এ কারণেই Dialogue of the Darkness শুধু একটি প্রজেক্ট নয়, এক দৃষ্টিভঙ্গি।

দৃষ্টিহীন ফটোগ্রাফার প্রণব লাল ক্যামেরা হাতে
লেখক: প্রলয় চ্যাটার্জি
ফটোগ্রাফার ও সাংবাদিক
ফটোগ্রাফি মানেই চোখ, এই ধারণাটা আমরা এতটাই স্বাভাবিক ধরে নিয়েছি যে প্রশ্নই করি না, চোখ ছাড়া কি ছবি সম্ভব? আলো, রং, ছায়া, ফ্রেম, সবকিছুর কেন্দ্রে যে দৃষ্টি, তার অনুপস্থিতিতে ক্যামেরা যেন নিছকই একটি যন্ত্র। কিন্তু দিল্লির এক তরুণ সেই বিশ্বাসকে ভেঙে দিয়েছেন নিঃশব্দে, দৃঢ়ভাবে।
প্রণব লাল।
একজন জন্মগতভাবে সম্পূর্ণ দৃষ্টিহীন মানুষ।
এবং একই সঙ্গে একজন আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ফটোগ্রাফার।
প্রথমবার তাঁর কাজের কথা শুনে আমারও মনে হয়েছিল, কোথাও নিশ্চয়ই একটা ব্যাখ্যা বাকি আছে। হয়তো কেউ সাহায্য করেন, হয়তো প্রযুক্তি শুধু বোতাম টেপার কাজটুকু সহজ করে দিয়েছে। কিন্তু যত গভীরে ঢুকেছি, ততই বুঝেছি, এটা কোনো ট্রিক নয়। এটা এক দীর্ঘ, একান্ত ব্যক্তিগত লড়াই। অন্ধকারের সঙ্গে এক গভীর সংলাপ। সেই সংলাপেরই নাম আমি দিয়েছি, Dialogue of the Darkness।
প্রণবের জন্ম হয়েছিল অকাল রেটিনোপ্যাথি নিয়ে। পৃথিবীর আলো, রং, আকাশ বা মানুষের মুখ, কিছুই তিনি কোনোদিন দেখেননি। সমাজ খুব দ্রুতই তাঁর ভবিষ্যৎ ঠিক করে দিয়েছিল। “স্বাভাবিক জীবন কঠিন হবে”, “কিছু কিছু কাজ ওর পক্ষে অসম্ভব”, এই বাক্যগুলো তাঁর শৈশবের নিত্যসঙ্গী। আর ফটোগ্রাফি? সে তো কল্পনারও বাইরে।
কিন্তু প্রণব এমন একজন মানুষ, যার অভিধানে “অসম্ভব” শব্দটা নেই।
কিশোর বয়সে তিনি পরিচিত হন এক অদ্ভুত সফটওয়্যারের সঙ্গে, vOICe। নেদারল্যান্ডসে তৈরি এই প্রযুক্তি ক্যামেরায় ধরা পড়া দৃশ্যকে রূপান্তর করে শব্দে। ছবির উঁচু-নিচু অংশ, রেখা, আলো-অন্ধকার, সব কিছু আলাদা আলাদা সাউন্ড প্যাটার্নে ভেসে ওঠে। আমাদের কাছে যা দৃশ্য, প্রণবের কাছে তা এক জটিল সাউন্ডস্কেপ।
শুরুর দিকের সেই অভিজ্ঞতা ছিল বিভ্রান্তিকর। শব্দগুলো অর্থহীন লাগত। কোথায় শুরু, কোথায় শেষ, কিছুই পরিষ্কার ছিল না। কিন্তু তিনি থামেননি। বছরের পর বছর অনুশীলন করেছেন। শব্দ শুনেছেন, আবার শুনেছেন। ধীরে ধীরে সেই শব্দগুলোর মধ্যে গঠন তৈরি হয়েছে। একসময় তিনি বুঝতে শুরু করেন, এটা দেয়াল, ওটা দরজা, এটা মানুষের অবয়ব, ওটা গাছ।
সেই বোঝাপড়ার ওপর ভর করেই প্রণব হাতে নেন ক্যামেরা।
এখানেই গল্পটা শুধু অনুপ্রেরণার নয়, কারিগরি দক্ষতারও। কারণ ছবি তোলা মানে শুধু বোতাম চাপা নয়। ফ্রেমিং, কম্পোজিশন, আলো, দূরত্ব, দৃষ্টিকোণ, সবকিছুর সিদ্ধান্ত নিতে হয় মুহূর্তের মধ্যে। প্রণব এই সিদ্ধান্তগুলো নেন শব্দের ভিত্তিতে, অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে, আর সবচেয়ে বেশি নিজের কল্পনাশক্তির ওপর ভর করে।
প্রথমদিকে তাঁর চারপাশের মানুষ বিশ্বাস করতে পারেনি। কেউ বলেছে, “অন্য কেউ নিশ্চয়ই ছবি তোলে।” কেউ আবার পুরো বিষয়টাকেই প্রচারের কৌশল বলে উড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, প্রদর্শনী আর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির মাধ্যমে প্রণব দেখিয়ে দিয়েছেন, শিল্প সৃষ্টির জন্য চোখই শেষ কথা নয়।
তিনি ভ্রমণ করেছেন বহু দেশে। পাহাড়, সমুদ্র, শহর, ঐতিহাসিক স্থাপনা, সবই ধরা পড়েছে তাঁর ক্যামেরায়। আইসল্যান্ডের নর্দার্ন লাইটসের মতো দৃশ্যও তিনি “দেখেছেন” শব্দের মাধ্যমে। প্রতিটি ভ্রমণ ছিল তাঁর জন্য অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জে ভরা। নতুন শহর, অচেনা বিমানবন্দর, অজানা শব্দের মানচিত্র। তবুও তিনি পিছিয়ে যাননি।
আজ প্রণব লাল শুধু একজন দৃষ্টিহীন ফটোগ্রাফার নন। তিনি এক শিল্পী, যিনি আমাদের শেখান, অন্ধত্ব মানেই অন্ধকার নয়। আলোকে দেখা যায় নানা ভাবে। কখনও চোখ দিয়ে, কখনও কল্পনা দিয়ে, কখনও প্রযুক্তি আর মননের মিলনে।
প্রণবের জীবন আসলে অন্ধত্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়। এটা সেই সমাজের বিরুদ্ধে এক শান্ত প্রতিবাদ, যারা খুব সহজে বলে দেয়, “তুমি পারবে না।” আর প্রণব তাঁর প্রতিটি ছবির মাধ্যমে উত্তর দেন,
“হ্যাঁ, আমি পারি। আমরাও পারি।”
Read more: ওমায়রা স্যাঞ্চেজ: যে মেয়ে মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে বিশ্বকে কাঁদিয়েছিল
Read more: সাকার ফিশ: কাচের অ্যাকুয়ারিয়ামের অতিথি থেকে নদীর মৃত্যুদূত
Read more: রুনু গুহনিয়োগীর ছায়ায় , সাতকাহন কথায় অনীল ঘোষাল (প্রাক্তন ডি.সি., কলকাতা পুলিশ)